বাংলাদেশ নিজেকে একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় দিতে চায়। সংবিধানে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সমতার আলো এখনো পৌঁছায়নি সমাজের সব স্তরে—বিশেষ করে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জীবনে।
২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার তৃতীয় লিঙ্গকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু শুধুমাত্র কাগজে-কলমে স্বীকৃতি দিয়ে কি একটি জনগোষ্ঠীর জীবন বদলে দেওয়া সম্ভব? বাস্তবতা বলছে—না।
আজও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই চরম বৈষম্যের শিকার। স্কুলে ভর্তি হতে গেলে তারা হয় উপহাসের শিকার, নয়তো সরাসরি প্রত্যাখ্যাত। কর্মক্ষেত্রে তাদের জন্য সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি বা অনিরাপদ পেশায় জড়িয়ে পড়েন।
আইন যতই পরিবর্তন হোক, সমাজের মানসিকতা যদি না বদলায়, তবে বাস্তব পরিবর্তন অসম্ভব। আমাদের সমাজ এখনো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের “ভিন্ন” বা “অস্বাভাবিক” হিসেবে দেখে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই জন্ম নেয় অবহেলা, ঘৃণা ও সহিংসতা।
পরিবার থেকেই শুরু হয় এই বঞ্চনা। অনেক শিশু তাদের লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে পরিবারের কাছ থেকেই প্রত্যাখ্যাত হয়। নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও সমর্থন না পেয়ে তারা খুব অল্প বয়সেই অনিশ্চিত জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে শুধু স্বীকৃতি নয়, প্রয়োজন কার্যকর নীতি ও বাস্তবায়ন।
এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকেও সংবেদনশীল হতে হবে, যাতে তারা কোনো ধরনের হয়রানি বা সহিংসতার শিকার না হন।
আমাদের বুঝতে হবে—তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা “অন্য কেউ” নয়, তারা আমাদেরই সমাজের অংশ। তাদেরও স্বপ্ন আছে, অনুভূতি আছে, মর্যাদার সাথে বাঁচার অধিকার আছে।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় নির্ভর করে সে কতটা তার দুর্বল ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়াতে পারে। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের প্রতি আমাদের আচরণই বলে দেবে আমরা কতটা মানবিক।
বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে—অর্থনীতি, প্রযুক্তি, অবকাঠামোতে। কিন্তু প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সমাজের প্রতিটি মানুষ সমান মর্যাদা পাবে। তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার নিশ্চিত করা শুধু একটি সামাজিক দায় নয়, এটি একটি মানবিক দায়িত্ব।
সময়ের দাবি এখন একটাই—অবহেলা নয়, স্বীকৃতি নয় শুধু, বরং সম্মান ও সমান অধিকার।